কোন দেশের কতটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, উৎপাদনে কার অবস্থান কত
জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে বিশ্বজুড়ে আবারও গুরুত্ব বাড়ছে পারমাণবিক শক্তির। নিরাপত্তা ও ব্যয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কম-কার্বন বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে অনেক দেশ এখন পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) বলছে, বর্তমানে বিশ্বের ৩১টি দেশে ৪১৫টির বেশি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে। এসব রিঅ্যাক্টরের মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩৭৯ গিগাওয়াট। একই সঙ্গে আরও ৭০টির বেশি রিঅ্যাক্টর নির্মাণাধীন রয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে পারমাণবিক শক্তির নতুন সম্প্রসারণের।
বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। উন্নত অর্থনীতির অনেক দেশে এই হার আরও বেশি, বিশেষ করে ইউরোপের কয়েকটি দেশে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) মনে করছে, আগামী দশকে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
উৎপাদনে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ৯৪টি চালু রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৯৭ গিগাওয়াট। যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে।
নির্ভরতায় এগিয়ে ফ্রান্স
ফ্রান্স-এ বর্তমানে ৫৭টি রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে। দেশটি সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও বিদ্যুতের বড় অংশই আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। ফ্রান্সে মোট বিদ্যুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ নির্ভরতার অন্যতম উদাহরণ।
দ্রুত এগোচ্ছে চীন
চীন এখন পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। দেশটিতে ৬০টি চালু রিঅ্যাক্টর রয়েছে এবং আরও বড় সংখ্যক রিঅ্যাক্টর নির্মাণাধীন। বর্তমানে নির্মাণাধীন বৈশ্বিক রিঅ্যাক্টরের বড় অংশই চীনে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দশকে পারমাণবিক সক্ষমতায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শক্ত অবস্থান
রাশিয়া-র ৩৪টি এবং দক্ষিণ কোরিয়া-র ২৬টি রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে। রাশিয়া শুধু নিজ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, বিদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও বড় ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া কম খরচে উচ্চ দক্ষতার পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য পরিচিত এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রযুক্তি রপ্তানি করছে।
জাপান, ভারত ও অন্যদের অগ্রগতি
জাপান-এ ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক খাত ধাক্কা খেলেও ধীরে ধীরে কিছু রিঅ্যাক্টর আবার চালু হচ্ছে। ভারত-এ ২১টি রিঅ্যাক্টর চালু রয়েছে এবং আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন। এছাড়া কানাডা, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
কেন আবার বাড়ছে গুরুত্ব
বিশ্বে কম-কার্বন বিদ্যুতের বড় উৎসগুলোর মধ্যে পারমাণবিক শক্তি এখনো অন্যতম। সৌর ও বায়ুশক্তির তুলনায় এটি বেশি স্থিতিশীল, কারণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো দীর্ঘ সময় ধরে টানা বিদ্যুৎ দিতে পারে। এই নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতাই একে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ছোট রিঅ্যাক্টর এখন নতুন আলোচনায়
বর্তমানে পারমাণবিক খাতের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি হলো স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (SMR)। এগুলো আকারে ছোট, তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল এবং দ্রুত নির্মাণযোগ্য। অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তির বিস্তারে এসএমআর বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ-এর প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত এই প্রকল্পে দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ









